আন্ডার-বিলিং, মিটার টেম্পারিং এবং অবৈধ পানির লাইনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। ঢাকার মোহাম্মদপুরে চারটি বিলাসবহুল বাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট ও গাড়ি, এবং গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানাধীন মাখল গ্রামে রাজকীয় প্রাসাদসহ বিস্তীর্ণ জমি—সব মিলিয়ে এক কথায় ছোটখাটো একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ঢাকা ওয়াসার সাবেক মিটার রিডার, বর্তমানে রাজস্ব পরিদর্শক হারুন অর রশীদ (রানা)।
চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ওয়াসা কর্তৃপক্ষ হারুনকে দায়মুক্তি দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ডিজিএফআই সদর দপ্তরে তার নামে নতুন অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়দের নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের বিবরণ উঠে এসেছে।
রাজস্ব পরিদর্শক হারুন বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার ২ নম্বর রাজস্ব জোনে কর্মরত। পূর্ববর্তী দায়িত্বস্থলগুলোতেও তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসার পিপিআই প্রকল্পের অন্যতম সুবিধাভোগী ছিলেন হারুন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজে ডিউটি না করে ব্যক্তিগত সহকারী মো. জাকির এবং অন্যান্য ডুপ্লির মাধ্যমে সাইট পরিচালনা করছেন। অথচ ২০১৮ সালের ৫ জুলাই ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বহিরাগত নিয়োগ নিষিদ্ধ করার পরও এই নিয়ম ভঙ্গ করা হচ্ছে।
যদিও তার মাসিক বেতন মাত্র প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, তবে সহকারী ও ড্রাইভারের মাধ্যমে তিনি প্রতিদিন কোটি টাকার সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরে তার সম্পদের তালিকায় রয়েছে—
মোহাম্মদপুর ৭/এ/১৫ টিক্কাপাড়া: ১টি বাড়ি
ঢাকা উদ্যান ৩ নম্বর রোড: ৪ তলা একটি বাড়ি
নূরজাহান রোড, হোল্ডিং নং এম/৮: ২ তলা একটি বাড়ি
চান মিয়া হাউজিং, ২ নম্বর রোড: ১টি বাড়ি
এছাড়া গাজীপুরের শ্রীপুর ও মাওনা, ময়মনসিংহের ভালুকা, পাইথল ও গফরগাঁওয়ে বিস্তীর্ণ জমি ও বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে।
গ্রামের মাখল মৌজায় রয়েছে রাজকীয় প্রাসাদ, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, কোটি কোটি টাকার কৃষিজমি ও দোকানঘর। অভিযোগ রয়েছে, বহু সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি-ভিটা দখল করেছেন তিনি।
অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা তার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া মামলার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে আতঙ্কিত করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সহকর্মীরা জানান, হারুন প্রায়ই দম্ভ করে বলেন,
“আমার একটি পশমও কেউ ছিঁড়তে পারবে না। টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ হয়ে যাবে।”
সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরে তার সব বাড়িই বিলাসবহুল প্রাসাদসম, যেখানে স্বর্ণালঙ্কৃত ফার্নিচার ও শতাধিক কোটি টাকার ব্যাংক ডিপোজিট রয়েছে। শূন্য থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার এই গল্প যেন আলাদিনের চেরাগের দৈত্যকেও হার মানায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলেও হারুনের অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য কারণে কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ক্ষমতার দাপটে তিনি সবকিছু ম্যানেজ করে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে হারুন দৈনিক সময়কে বলেন,
“এগুলো পুরোনো কাহিনী। আমার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সব ট্যাক্স ফাইলে রয়েছে। দুদক বহুবার আমাকে ডেকেছে, তদন্তের পর কিছুই পাওয়া যায়নি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।”
এই ঘটনা সামনে এনে সচেতন মহল মনে করছে, সাধারণ একজন মিটার রিডার থেকে রাজস্ব পরিদর্শক হয়ে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়—এটি সরকারের রাজস্ব, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা।