দেশজুড়ে যখন বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তীব্রতর, বিশ্বজুড়েও যখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের অস্থিরতা চরমে—ঠিক এমন সময় রাজধানীর বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) পিএলসিকে ঘিরে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ডেসকোর একটি অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিতভাবে সরকারি সম্পদ লুটপাটে জড়িয়ে পড়েছে।
একসময় দেশের বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম লাভজনক কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল ডেসকো। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৫ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে এবং ঢাকা শহরের একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই সম্প্রতি সামনে এসেছে কোটি কোটি টাকার আন্ডারগ্রাউন্ড কপার ক্যাবল উধাও হওয়ার ঘটনা, যা বিদ্যুৎ খাতের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেসকোর বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচে স্থাপিত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি আন্ডারগ্রাউন্ড কপার ক্যাবল পরিকল্পিতভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় মাটির নিচে পড়ে থাকা এসব ক্যাবলের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ডেসকোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অধীনে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এসব লাইনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, রুট ম্যাপ এবং কারিগরি তথ্য শুধুমাত্র ডেসকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেই সংরক্ষিত থাকে। অভিযোগ উঠেছে, এই গোপন তথ্যের সুযোগ নিয়েই ডেসকোর ভেতরের একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এই ক্যাবল চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত প্রায় তিন মাস ধরে ডেসকোর কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ডেসকোর জিয়া পরিষদের সভাপতি ও ম্যানেজার সাজেদুল করিম তার অফিস কক্ষেই এসব বৈঠকের আয়োজন করতেন। বৈঠকে স্থানীয় কিছু চাঁদাবাজ এবং বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু বহিষ্কৃত নেতার উপস্থিতির অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেসকোর প্রধান কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে এই বৈঠকের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছেন ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) এ. জেড. এম. শারজিল হাসান।
ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৩, ১৪ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে উত্তরা, টঙ্গী ও দক্ষিণখান এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু স্থানে ডেসকোর লাইনম্যান ও ফোরম্যানরা সন্দেহজনকভাবে ক্যাবল উত্তোলনের বিষয়টি দেখে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে ম্যানেজার সাজেদুল করিমের ফোনে নির্দেশনা রয়েছে বলে দাবি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ডেসকোর লোক পরিচয় দিয়ে কাজ চালিয়ে যান।
পরবর্তীতে বিষয়টি কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলে ধীরে ধীরে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
সূত্র আরও জানায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর থেকেই এই চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর কয়েক দফায় রাতের অন্ধকারে মাটির নিচে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা অকেজো আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল উত্তোলন করা হয়।
এদিকে পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সেটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। সূত্র জানায়, ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)-এর ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ম্যানেজার সাজেদুল করিম এবং নির্বাহী পরিচালক এ. জেড. এম. শারজিল হাসান এই ঘটনা চাপা দিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
শুধু তাই নয়, ‘জিয়া পরিষদ’-এর নাম ব্যবহার করে ডেসকোর বিভিন্ন অফিসে কর্মরত কিছু ব্যক্তি সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকেও অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থের একটি অংশ ম্যানেজার সাজেদুল করিমের কাছেও পৌঁছায়।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিদ্যুৎ খাত এমনিতেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঘনঘন বিদ্যুৎ সমস্যায় যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা—ঠিক তখন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের লুটপাটের অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, এমন অনিয়ম শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিই নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সচেতন মহলের দাবি, ডেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।