নাম মোবারক হোসেন, ওরফে ‘কালা মোবারক’ ও ‘গলাকাটা মোবারক’। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে তিনি। একসময় পেশায় ছিলেন রংমিস্ত্রির সহকারী। পুলিশের দাবি, সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। গত ২৬ আগস্ট ফটিকছড়ি এলাকা থেকে মোবারককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তার তিন সহযোগীকেও আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি এবং চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোবারকের বিরুদ্ধে প্রথম হত্যার অভিযোগ ওঠে ২০১৪ সালে। ওই সময় ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামে এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার পর থেকেই ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিতি পান তিনি। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন।
পুলিশের দাবি, বর্তমানে মোবারক চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতেন। ডেভিড ইমন আবার বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষসন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে কাজ করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। চট্টগ্রাম শহর থেকে রাউজান পর্যন্ত এলাকায় ডেভিড ইমনের একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক রয়েছে বলেও দাবি পুলিশের।
চট্টগ্রামের অপরাধজগতে ‘শুটার’ হিসেবে মোবারকের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে থাকা বড় সাজ্জাদের গ্রুপে অস্ত্র চালনায় দক্ষতার কারণে তার গুরুত্ব ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুই হাতে একসঙ্গে গুলি চালাতে পারতেন মোবারক। এমনকি নিজের নাম লিখতে পারার মতো সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অস্ত্র পরিচালনায় তার দক্ষতা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে সংঘটিত কয়েকটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এসব ফুটেজে প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা, চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা এবং দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এসব ঘটনার পরও এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন মোবারক। শেষ পর্যন্ত গত ২৬ আগস্ট পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি।
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর পর ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করতেন মোবারক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলে আবার এলাকায় ফিরে এসে হত্যা, চাঁদাবাজি ও গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়তেন।
পুলিশের তথ্যমতে, মোবারক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। সাজ্জাদের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন মোবারক। পরে নাছির গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈয়বের সঙ্গে মোবারকের একাধিক ছবিও রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক জানিয়েছেন, ডেভিড ইমনের কাছ থেকেই তিনি অস্ত্র চালানো শিখেছেন। দুই হাতে অস্ত্র চালানো তার শখ বলেও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশের দাবি, গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজেও মোবারককে দুই হাতে অস্ত্র চালাতে দেখা গেছে।
এদিকে, গত ২৬ আগস্ট পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগেও পুলিশের ওপর গুলি চালান মোবারক। পুলিশ জানায়, তিনি পরপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন তিনি।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার মোবারক যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরী, সরোয়ার বাবলাসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।