‘বন্দিদের মাথায়, কানে বা বুকে গুলি করতেন জিয়া স্যার। কাউকে একটি, আবার কাউকে দুটি গুলি করা হতো। এরপর বন্দিদের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী আব্বাস মল্লিক। বুধবার ট্রাইব্যুনালে দশম সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। ৬০ বছর বয়সী আব্বাস মল্লিক বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চরদুয়ানী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় জেলে এবং পাশাপাশি হালচাষ করেন।
জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক জানান, ২০১০ সালে চরদুয়ানী ও কাঁঠালতলী এলাকায় র্যাব সদস্যদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অভিযানের জন্য ট্রলার মালিকদের ডেকে নেওয়া হতো। র্যাব সদস্যরা এলাকায় আসার দিন বিকেলে সাদা পোশাকে দুজন ব্যক্তি ঘোরাফেরা করতেন এবং দোকান মালিকদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ ও বাতি নিভিয়ে রাখার নির্দেশ দিতেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র্যাবের চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস বরফ মিলের সামনে এসে থামত। এরপর ঢাকা থেকে আনা বন্দিদের ট্রলারে তোলা হতো। তাদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। বন্দিদের তোলার সময় সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা রিয়াজের দোকান থেকে নেওয়া হতো বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি।
আব্বাস মল্লিক বলেন, বন্দিদের নিয়ে ট্রলার চালিয়ে বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। সেখানে র্যাব সদস্যরা বন্দিদের ট্রলারের ভেতর থেকে বের করে আনতেন। এরপর দুই সদস্য একজন বন্দিকে ট্রলারের পাশের সাপোর্টের ওপর চেপে ধরে রাখতেন এবং ‘জিয়া স্যার’ ওই বন্দির মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন বলে দাবি করেন তিনি।
তারপর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে জানান আব্বাস। এভাবে একের পর এক বন্দিকে হত্যার পর তারা সুন্দরবনের দিকে যেতেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষীর দাবি, সুন্দরবনে যাওয়ার পর অন্য বন্দিদের ট্রলার থেকে নামিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধের মতো ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করা হতো। পরে সাংবাদিকদের ফোন করে ডেকে আনা এবং বিভিন্ন থানায় লাশ জমা দেওয়ার ঘটনাও ঘটত বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান।
আব্বাস মল্লিক আরও বলেন, ট্রলার নিয়ে ফিরে আসার পর সেগুলো ধোয়ার সময় বন্দিদের কাটা পেট থেকে বের হওয়া নাড়িভুঁড়ি, মাথায় গুলি করলে বেরিয়ে আসা মগজ এবং রক্তের দাগ দেখতে পেতেন তারা।
জবানবন্দিতে তিনি আরও দাবি করেন, এসব ঘটনার পর মেজর সাব্বির তাদের বলতেন, ‘তোমাদের জিয়া স্যার ডাকেন।’ এরপর তারা জিয়া আহসানের কাছে গেলে কখনো ২ হাজার, কখনো ৫ হাজার টাকা করে খামে দেওয়া হতো।
ভাই নিখোঁজের অভিযোগ
সাক্ষ্যে আব্বাস মল্লিক তার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন। তার দাবি, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন র্যাবের পরিচয়ে ফোন করে আলকাছকে ‘জিয়া স্যারের’ সঙ্গে দেখা করতে বটতলা মানিকখালীতে যেতে বলা হয়।
দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার দিকে আলকাছের স্ত্রী তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান।
এরপর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও আলকাছের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন আব্বাস। পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও জানান তিনি। তবে সেখানে জিয়া আহসান ও র্যাবের নাম লিখতে চাইলেও তা লেখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্বাস মল্লিক বলেন, ‘হয়তো বন্দিদের মতো আলকাছকেও হত্যা করা হয়েছে।’ এ ঘটনায় তিনি জিয়া আহসানের বিচার দাবি করেন। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত জিয়াউল আহসানকে তিনি আগে দেখেছেন বলেও জানান।
জবানবন্দি শেষে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান সাক্ষীকে জেরা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলামসহ অন্যরা।
‘মনে হয় আমি সবার টার্গেট’
এদিকে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে ভেস্ট পরানো থেকে অব্যাহতি চান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় প্রশিক্ষণের সময় কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। কিন্তু কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় তাকে হাতকড়া, হেলমেট ও বুকে ভেস্ট পরানো হচ্ছে। এ থেকে অব্যাহতি চেয়ে তিনি বলেন, ‘তবে মনে হয় আমি সবার টার্গেট। আমি সুবিচার চাই।’
এ বিষয়ে প্রসিকিউশনের মতামত জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জেল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। নিরাপত্তাজনিত কারণেই তাকে এভাবে আনা হচ্ছে বলে তার ধারণা।
পরে ট্রাইব্যুনাল থেকে জিয়াউল আহসানকে একটি আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তার আইনজীবী নাজনীন নাহার জানান, তারা এ বিষয়ে আবেদন করবেন।