যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আব্দুল রেজ্জাকের দায়িত্বকাল যেন একের পর এক প্রকল্পে অনিয়ম, অতিমূল্য দেখানো, ভুয়া বিল, ঘুষ–বাণিজ্য ও অডিট জালিয়াতির দীর্ঘ ছিপছিপে ইতিহাস—এমনটাই প্রকাশ পাচ্ছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। ২০২৩–২৪–২৫ অর্থবছরের “শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পে” প্রায় ১০ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁর সব পুরোনো প্রকল্পের অন্ধকার চিত্র আবার সামনে এসেছে। তদন্তে দেখা যায়—প্রশিক্ষণার্থী তালিকা ভুয়া, পুরোনো কম্পিউটারকে নতুন হিসেবে অতিমূল্যে দেখানো, একই ব্যাচকে একাধিকবার দেখিয়ে বিল উত্তোলন, ভুয়া সফর ভাতা, টেন্ডার কারচুপি, অডিট কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে রিপোর্ট ম্যানেজ—এসব ছিল তাঁর সুসংগঠিত দুর্নীতির পদ্ধতি। তিনি যে প্রকল্পেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানে একই ধাঁচে কাগজে–কলমে প্রশিক্ষণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা উধাও করার অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে যুব প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পে ৩০–৪০% বিলই ভুয়া; মোবাইল/আইসিটি সক্ষমতা প্রকল্পে ২৫–৩০% অতিমূল্য; গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্পে মাঠ কার্যক্রম কাগজে সাজানো—এসবই প্রমাণ করে তাঁর দুর্নীতির প্যাটার্ন ছিল পরিবর্তনহীন ও পেশাদারভাবে পরিচালিত। কর্মকর্তারা গোপনে জানিয়েছেন—“রেজ্জাক যেখানে প্রকল্প পরিচালক, সেখানেই কমিশন ভাগাভাগির হার নির্ধারিত থাকত ১৮–২৫%।”
এদিকে অভিযোগ রয়েছে—এই টাকার বড় অংশই তিনি আত্মীয়দের নামে সম্পদ রেজিস্ট্রি করে লুকিয়েছেন। ঢাকায় ধানমন্ডি–জিগাতলায় ফ্ল্যাট, নিকুঞ্জে বহুতল বাড়ি, জামালপুরে পাঁচতলা স্থাপনা, নারায়ণগঞ্জে জমি, ছেলের যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা—এসব সম্পদ সরকারি বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এবং অধিকাংশই স্বজনদের নামে। অভিযোগ আরও বলছে—দুর্নীতির খবর প্রকাশের ঠিক আগেই তিনি দ্রুত পেনশনের কাগজপত্র সম্পন্ন করে ‘নির্বিঘ্ন রিটায়ারমেন্ট’ নিশ্চিত করেন এবং বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—রিটায়ারমেন্ট মানেই দায়মুক্তি নয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী—দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত অপরাধ ও দুর্নীতির জন্য সরকার চাইলে রিটায়ারমেন্ট–উত্তরেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চালাতে পারে, পেনশন ও গ্র্যাচুইটির সম্পূর্ণ বা আংশিক স্থগিত রাখতে পারে, দুর্নীতি প্রমাণিত হলে সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা করতে পারে; বিএফআইইউ সম্পদের উৎস যাচাই করে ‘অবৈধ সম্পদ ক্রোক’ বা ‘অকারণে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত’ করার সুপারিশ দিতে পারে; আদালত চাইলে তাঁর রিটায়ারমেন্ট সুবিধা স্থগিত, ব্যাংক হিসাব জব্দ, পাসপোর্ট বাতিল এবং বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি মামলা চলবে এবং দোষী হলে কারাদণ্ডসহ অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে। অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে—রেজ্জাকের মতো কর্মকর্তারা রিটায়ার হওয়ার আগেই দুর্নীতির ফাইল বন্ধ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন, কিন্তু আইনগতভাবে তাঁর সব সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বৈদেশিক লেনদেন এবং আত্মীয়দের নামে রেজিস্ট্রিকৃত সম্পদ—সবই এখন তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব।
ফলে স্পষ্ট—যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে যে অনিয়ম, অতিমূল্য, ভুয়া বিল, অডিট কারচুপি ও কমিশন বাণিজ্য তিনি ছড়িয়ে রেখে গেছেন, তার দায় থেকে রেজ্জাক রিটায়ারমেন্টের আড়ালে লুকাতে পারবেন না। ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের ১০ কোটি টাকার দুর্নীতি তাঁর দীর্ঘদিনের অনিয়মের কেবল একটি অধ্যায়; প্রশ্ন এখন—এই দুর্নীতির পেছনে তাঁর সহযোগীরা কারা, এবং সরকারি অর্থের এই বিপুল ক্ষতির বিচার কি আদৌ হবে?