খুলনার তরুণদের মাসে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাচারের অভিযোগ উঠেছে একটি দালালচক্রের বিরুদ্ধে। কম্পিউটারসংক্রান্ত কাজের কথা বলে বিদেশে নেওয়ার পর তাদের চীনা ও থাই মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। পরে জিম্মি করে অনলাইনে মেয়েদের সঙ্গে যৌন চ্যাটিং, পর্নোগ্রাফিক ও অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন।
অভিযোগের ঘটনায় চলতি মাসের ৩ আগস্ট পাচারচক্রের মূলহোতা জিহাদ আলী লস্কর জজ ও তার স্ত্রী সুমাইয়া সুমিকে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা খুলনার দৌলতপুরের বাসিন্দা। কম্বোডিয়া থেকে কোনোমতে দেশে ফিরে আসা মোস্তাকিম হাসান কাজীসহ দুই ভুক্তভোগী এসব অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জিহাদ ও তার স্ত্রী সুমি বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলছিলেন। কম্পিউটারসংক্রান্ত কাজ এবং মাসে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বেতনের আশ্বাস দিয়ে খুলনার একাধিক তরুণকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। তাদের অনেকেই জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে জনপ্রতি ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালচক্রের হাতে তুলে দেন।
তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিমানবন্দর থেকেই তাদের অপহরণের আদলে নিয়ে গিয়ে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারে চীনা ও থাই মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো। পরে বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও হোটেলে আটকে রেখে অনলাইনে মেয়েদের সঙ্গে যৌন চ্যাটিংসহ পর্নোগ্রাফিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো।
ভুক্তভোগী মোস্তাকিম হাসান কাজী অভিযোগ করেন, ভালো চাকরির কথা বলে তাদের কম্বোডিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হয়। মাফিয়াদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর নির্যাতন চালানো হতো। এমনকি ভারী বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং দিনের পর দিন খাবার না দিয়ে ঘরে আটকে রাখার অভিযোগও করেন তিনি।
মোস্তাকিমের দাবি, শুধু খুলনা নয়, বাংলাদেশের আরও অনেক তরুণ একইভাবে কম্বোডিয়ায় প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার হচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খুলনার অনেক তরুণকে এভাবে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়েছে। সে সময় দালালচক্রের সদস্য জিহাদও কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী মনিরুল ইসলাম মুকুল জানান, মাফিয়াদের হাত থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ ছিল না। দেশে ফিরতে বা উদ্ধার পেতে বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে হতো। তার দাবি, খুলনার দুই তরুণকে থাইল্যান্ডের মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করা হয়। কম্বোডিয়া থেকে থাইল্যান্ডে নেওয়ার পথে তারা সীমান্তে গোলাগুলির মধ্যেও পড়েন। পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে তারা দেশে ফেরার সুযোগ পান।
জিহাদ দম্পতির বিরুদ্ধে প্রতারণার শিকার হওয়া খুলনার অন্তত চার তরুণ দেশে ফিরে একত্রিত হয়ে খুলনার আদালতে মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই খুলনা। প্রাথমিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে ৩ আগস্ট জিহাদ ও তার স্ত্রী সুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানান, প্রাথমিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে কম্বোডিয়ায় তরুণদের পাচারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।