রাজধানীর উন্নয়ন কার্যক্রমের আড়ালে আবারও প্রকাশ্যে এসেছে দুর্নীতির এক সুসংগঠিত চক্রের ভয়াবহ চিত্র। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-এর অঞ্চল–৬ এ উত্তরা এলাকায় বাস্তবায়িত একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ ভাগবাটোয়ারার গুরুতর অভিযোগ। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছেন অঞ্চল–৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।
সূত্রমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জোন–৬ এর উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে “রোড উন্নয়ন, আরসিসি পাইপ স্থাপন, ড্রেন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে নিয়ম-কানুনকে পাশ কাটিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কৌশলে বিকৃত করা হয়েছে।
বিশেষভাবে উঠে এসেছে এসএম রহমান ইন্টারন্যাশনালের নাম, যারা চলমান কাজের তথ্য গোপন রেখেই দরপত্রে অংশ নেয়। অথচ সেই গোপন তথ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা—বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ—অবগত থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। যা কেবল অনিয়ম নয়, বরং সুস্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরিকল্পিত দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।
একই চিত্র দেখা যায় সাবরিনা এন্টারপ্রাইজ ও রাইফ এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে। দরপত্রে সিমিলার ওয়ার্ক ৩ কোটি এবং বার্ষিক টার্নওভার ৩৫ কোটি টাকার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করে যৌথভাবে ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার কাজ বাগিয়ে নেয় এই প্রতিষ্ঠান দুটি। সঞ্জীব এন্টারপ্রাইজও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ না করেই ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কাজ পেয়ে যায়—যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর চিত্র দেখা যায় মোল্লা এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে। সিমিলার ওয়ার্ক ৬ কোটি এবং টার্নওভার ৬০ কোটি টাকার শর্ত একটিও পূরণ না করেও প্রতিষ্ঠানটি ৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাজ পেয়ে যায়। একইভাবে আইজা এন্টারপ্রাইজ ও এমএস লরিন এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে টার্নওভার ও টেন্ডার ক্যাপাসিটির তথ্য গোপন করেও ৯ কোটি ৯ লাখ টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়। একের পর এক এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, এখানে নিয়ম নয়—চলেছে প্রভাব, লবিং এবং অঘোষিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী, যথাযথ টেন্ডার ক্যাপাসিটি, সিমিলার ওয়ার্কের অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রদান ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একাধিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এসব শর্তকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, এমনকি চলমান কাজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে—যা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন।
ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় পরিচয় এবং শক্তিশালী লবিংয়ের মাধ্যমে এই টেন্ডারগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরেই অফিসিয়াল কার্যক্রমের আড়ালে একটি প্রভাবশালী দুর্নীতি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদ। তিনি দাবি করেন, বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করতে হবে। এমনকি সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করে অনুরোধ জানান তিনি—যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যঘেরা করে তুলেছে।
এদিকে, এই ঘটনায় ডিএনসিসির অভ্যন্তরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে যদি এভাবে নিয়ম ভেঙে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়, তবে তা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়—বরং নগর উন্নয়ন ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের জোর দাবি—এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এমন লাগামহীন দুর্নীতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।