খুলনায় স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার পর পুনরায় খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদে ফেরা মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ বর্তমানে খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার যোগদানের পর থেকেই খুলনা বিভাগের খাদ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক, অস্বস্তি এবং অবরুদ্ধ প্রশাসনিক পরিবেশ। অভিযোগ রয়েছে—তিনি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশ অমান্য করে নিজের সিদ্ধান্তেই বদলি–পদায়ন কার্যক্রম চালাচ্ছেন এবং যেসব কর্মকর্তা তার নির্দেশ অনুযায়ী যোগদান করছেন না, তাদের ওপর নানাভাবে মানসিক চাপ, প্রশাসনিক হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির হুমকি প্রয়োগ করছেন।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক বদলি–পদায়ন আদেশ জারি এবং সেইসব আদেশ বাস্তবায়নে জোরাজুরি শুরু করেন। অথচ ৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে খাদ্য মন্ত্রণালয়, উপসচিব মো. রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়—৩ নভেম্বরের পূর্বের কোনো বদলি–পদায়ন আদেশ বাস্তবায়ন করা যাবে না। তবুও মামুনুর রশিদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ও আর্থিক লেনদেনের সুবিধার্থে সেই সব আদেশ কার্যকর করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুলনার ১০ জেলার ৭৮টি খাদ্য গুদামে পরিদর্শনের নামে মোট ৫০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বদলির ভয় দেখিয়ে কর্মকর্তাদের জিম্মি করে রাখা, অযোগ্যদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশীর্বাদে পদায়ন করা, আর যোগদান না করলে শাস্তিমূলক বদলি—এসব অভিযোগ ইতোমধ্যে উচ্চমহলেও পৌঁছেছে।নওয়াপাড়া ও মনিরামপুর খাদ্য গুদামের দুই কর্মকর্তা এই ‘বদলি আতঙ্ক’-এর সরাসরি ভুক্তভোগী। তাদের বিরুদ্ধে পুরনো ও নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ নতুন করে তুলে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাদের স্থানে পদায়ন করা হয়েছে একাধিক মামলা ও বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিকে—পলাশ আহমেদকে। তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা ও অপরাধমূলক রেকর্ড থাকলেও তাকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।খাদ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—খাদ্যশস্য বিতরণে ব্যবহৃত পুরনো সরকারের স্লোগানযুক্ত বস্তা নিয়ে দায় চাপানো হয়েছে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর। কয়েকটি বস্তায় কালি না মুছতে পারা নিয়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এর প্রকৃত দায় সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ এড়াতে চাইছে।খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান এ বিষয়ে বলেন, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকলেও তিনি যদি কোনো মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিকে পদায়ন করেন, তবে সেই মামলার চার্জশিট ডিজির মাধ্যমে পাঠাতে হবে—এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।অন্যদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক প্রশাসন এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কেউ সাড়া দেননি।মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা, বদলি–পদায়ন বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক ক্যাডার পদায়ন এবং কর্মকর্তাদের প্রতি হয়রানি—সব মিলিয়ে খুলনার খাদ্য বিভাগ বর্তমানে চরম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন—একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত যেন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকেও অকার্যকর করে দিচ্ছে, আর তারা নিজেদের সম্পূর্ণ অসহায় ও ঝুঁকির মধ্যে অনুভব করছেন।