ওপেক (OPEC) জোট থেকে বেরিয়ে আসার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) খনিজ তেল উৎপাদনে নতুন রেকর্ড গড়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন বেড়ে ৪১ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৫ সালে দেশটির গড় দৈনিক উৎপাদন ছিল ৩৫ লাখ ব্যারেল এবং ২০২০ সালে রাশিয়া-সৌদি আরবের মূল্যযুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল ৪০ লাখ ব্যারেল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ওপেকের উৎপাদন নীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছিল না আবুধাবি। উৎপাদন বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সৌদি আরবের অবস্থানের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে উৎপাদন সীমিত রাখতে হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন, সুদান ও ইসরাইল-সংক্রান্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে সৌদি আরবের সঙ্গে নীতিগত দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর গত মে মাসে ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন। ইরান-ইসরাইল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত আসে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হলেও পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশলগত মজুত থেকে তেল সরবরাহ এবং চীনের তেল আমদানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় বড় ধরনের বাজার অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে আগেই বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন ফুজিরাহ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা সরাসরি ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে এই পাইপলাইন ইরানি ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকায় বিকল্প কৌশলও গ্রহণ করেছে আবুধাবি। সাম্প্রতিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন-ইসরাইলি জোটের অংশ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে হামলার ঝুঁকি কমাতে ইরানকে বিপুল অর্থ প্রদান করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ট্রান্সপন্ডার বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে ‘ডার্ক ভেসেল’ বা ছদ্মবেশী তেলবাহী জাহাজ ব্যবহার করেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন অব্যাহত রেখেছে দেশটি বলে দাবি করা হয়েছে।
আইএইএ তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়লেও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ডিজেল, এলপিজি ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ এখনও অর্ধেকেরও কম। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার অনেক দেশকে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। তবুও নিজস্ব বৃহৎ ট্যাংকার বহর এবং ঝুঁকিপূর্ণ রুটে চলাচলে আগ্রহী নৌপরিবহন সংস্থাগুলোর সহায়তায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।