মোবাইল ফোনে জরুরি প্রয়োজনে নেওয়া ইমার্জেন্সি ব্যালান্সের সর্বোচ্চ সীমা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ২০০ টাকার বেশি থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ টাকা সেবা ফি দিতে হতে পারে। এর সঙ্গে প্রযোজ্য কর যুক্ত হলে গ্রাহকের মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ১৩ টাকা ৯০ পয়সা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ কমিশন সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
অপারেটরগুলোর বক্তব্য, বর্তমান সীমার কারণে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় ডেটা বা মিনিটের প্যাকেজ কিনতে সমস্যায় পড়েন। যেমন, কোনো প্যাকেজের দাম ৩১০ টাকা হলে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ইমার্জেন্সি ব্যালান্স নিয়ে সেটি কেনা সম্ভব নয়। রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যালান্সের সীমা বাড়ানো হলে গ্রাহকেরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তুলনামূলক বেশি দামের প্যাকেজও কিনতে পারবেন।
দেশে মোবাইল সেবা দিচ্ছে চারটি অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটক। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, এই চার প্রতিষ্ঠানের মোট গ্রাহকসংখ্যা ১৯ কোটির বেশি। শুরুতে জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহকদের সামান্য পরিমাণ টাকা ব্যবহারের সুযোগ দিতে ইমার্জেন্সি ব্যালান্স চালু করা হয়। ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি নির্দেশ দেয়, গ্রাহকদের অন্তত ১০ টাকা ব্যালান্স দিতে হবে এবং এ জন্য কোনো চার্জ নেওয়া যাবে না। পরে একই বছরের ২ জুলাই অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স থাকবে সম্পূর্ণ চার্জমুক্ত। এর বেশি পরিমাণের ক্ষেত্রে সেবা ফি নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
বর্তমানে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত ইমার্জেন্সি ব্যালান্স দেয়। এ ক্ষেত্রে করসহ সেবা ফির পরিমাণ ২ টাকা ৭৮ পয়সা। অন্যদিকে, টেলিটকের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ টাকা এবং এর সেবা ফি করসহ ৬ টাকা ৯৫ পয়সা। অপারেটরগুলোর দাবি, ইমার্জেন্সি ব্যালান্সের ব্যবহার এখন শুধু টাকা ধার নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে মিনিট লোন, ডেটা লোন, ‘বাই নাও পে লেটার’ এবং বিভিন্ন প্যাকেজ কেনার সুবিধাও যুক্ত হয়েছে। এসব ব্যবস্থায় গ্রাহক আগে সেবা ব্যবহার করেন এবং পরবর্তী সময়ে রিচার্জ করলে বকেয়া টাকা ও নির্ধারিত ফি কেটে নেওয়া হয়।
মোবাইল অপারেটর সূত্রের দাবি, চার প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ লাখ গ্রাহক ইমার্জেন্সি ব্যালান্স ব্যবহার করেন। তবে এই অর্থ সরাসরি অপারেটরগুলো সরবরাহ করে না। তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বে থাকা অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণসেবার অর্থ জোগান দেয়। ফলে ব্যালান্সের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে গ্রাহকদের সুবিধার পাশাপাশি এ ধরনের ঋণসেবার পরিধি সম্প্রসারণের বিষয়টিও জড়িত।
ইমার্জেন্সি ব্যালান্সের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রথমে নেয় গ্রামীণফোন। ২০২৬ সালের ৩ মার্চ বিটিআরসিকে পাঠানো চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স দেওয়ার অনুমতি চায়। এ জন্য সর্বোচ্চ ২০ টাকা সেবা ফির প্রস্তাবও দেওয়া হয়। গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, ডেটা ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী এবং বেশি ডেটা ব্যবহার করা গ্রাহকদের জন্য বর্তমান সীমা অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, সীমা বাড়ানো হলে তা গ্রাহকদের বর্তমান ব্যবহার ও যোগাযোগের চাহিদার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তবে গ্রামীণফোনের এককভাবে সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবে অন্য অপারেটরগুলো আপত্তি জানায়। গত ২১ জুন বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠকে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে, একটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে এ সুবিধা দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং অনাদায়ি অর্থের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এরপর সব অপারেটরের জন্য অভিন্ন প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবকে দেয় বিটিআরসি।
৫০০ টাকা সীমায় সম্মতি, সেবা ফি নিয়ে মতপার্থক্য
চলতি বছরের ২৩ জুলাই অ্যামটব বিটিআরসির কাছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত ইমার্জেন্সি ব্যালান্স দেওয়ার প্রস্তাব জমা দেয়। এতে ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সে কোনো ফি না রাখা, ১০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সের জন্য ২ টাকা এবং ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ফি নির্ধারণের কথা বলা হয়। পরে ২০ আগস্ট বিটিআরসি ও অ্যামটবের বৈঠকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ টাকা সেবা ফি রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
অ্যামটব সূত্র জানায়, গ্রামীণফোন, রবি ও টেলিটক এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে। তবে বাংলালিংক ব্যালান্সের পরিমাণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুসারে, ১১ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সে ২ টাকা, ২১ থেকে ৫০ টাকায় ৩ টাকা এবং ১৫১ থেকে ২০০ টাকায় ৬ টাকা ফি নেওয়া হবে। আর ৪০১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্স নিলে সেবা ফির পরিমাণ হবে ১০ টাকা।
বাংলালিংকের প্রস্তাব কার্যকর হলে ২০০ টাকার কম ব্যালান্স নেওয়া কিছু গ্রাহকের খরচও বর্তমানের তুলনায় বাড়তে পারে। কারণ, বর্তমানে ২০০ টাকা পর্যন্ত ইমার্জেন্সি ব্যালান্সের জন্য সেবা ফি নির্ধারিত রয়েছে মাত্র ২ টাকা। করসহ এই ফি দিতে হয় ২ টাকা ৭৮ পয়সা। নতুন প্রস্তাবে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালান্সের জন্য ১০ টাকা সেবা ফির সঙ্গে একই হারে কর যুক্ত হলে মোট ফি দাঁড়াবে ১৩ টাকা ৯০ পয়সা।
তবে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ইমার্জেন্সি ব্যালান্স দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো তা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। বিটিআরসির অনুমোদন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই নতুন সীমা এবং সেবা ফির কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।