একসময় লেবু বাগানের জন্য সুপরিচিত ছিল সুদানের উত্তর কোর্দোফানের বাজার শহর বাড়া। বসন্তে শহরের চারপাশ ছড়িয়ে পড়ত লেবুফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। কিন্তু গৃহযুদ্ধ ও ভয়াবহ সহিংসতার পর সেই পরিচিত দৃশ্য এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময়ের প্রাণবন্ত শহরটি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। যেখানে লেবু গাছে পানি দেওয়ার কথা, সেখানে এখন মানুষের রক্তের দাগ।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাড়ায় প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস ছিল। বর্তমানে শহরটি প্রায় জনশূন্য। বিভিন্ন সড়ক ও এলাকায় পড়ে রয়েছে অসংখ্য মরদেহ। আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) হাতে নিহত এসব মানুষকে দাফনের সুযোগও দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও তাদের সহযোগীরা আরএসএফকে পরাজিত করে বাড়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শহরে প্রবেশের পর তাদের চোখে পড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি। বাড়ির ভেতর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট—বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা অসংখ্য লাশ পচে-গলে যাচ্ছে। ফলে একসময় যে শহরের বাতাসে লেবুফুলের সুবাস ছড়িয়ে থাকত, সেখানে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পচনশীল মরদেহের তীব্র দুর্গন্ধ।
শহরের এক প্রকৌশলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পচে যাওয়া মরদেহের কারণে বাড়ার পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দূষিত হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বাড়ার পানির মূল উৎস ভূগর্ভস্থ কূপ, যার গভীরতা ২০ থেকে ৩০ মিটারের বেশি নয়। পচন ধরা লাশগুলোর তরল উপাদান এসব পানির উৎসে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এমনটা ঘটলে মানুষ ও গবাদিপশুর জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে।’
খাড়তুম থেকে খনিজসমৃদ্ধ কোর্দোফান অঞ্চলে যাওয়ার কৌশলগত পথে অবস্থিত বাড়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এসএএফ ও আরএসএফের মধ্যে সংঘর্ষ চলে আসছে। গত বছরের অক্টোবরে শহরটি দখলে নেয় আরএসএফ। এরপর মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেনাঘাঁটি ‘এল-ওবেইদ’-এ ড্রোন হামলার ঘাঁটি হিসেবেও বাড়াকে ব্যবহার করা হয়।
উত্তর কোর্দোফানের পপুলার রেজিস্ট্যান্স কমিটির সদস্য ওসমান আব্দুল লতিফ জানান, বাড়ায় আরএসএফের চালানো নৃশংসতার ঘটনা অন্য এলাকার তুলনায় গণমাধ্যমে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। তবে তার ধারণা, বাড়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখানে গিয়ে তারা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পান বলে জানান ওসমান আব্দুল লতিফ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো শহর জনশূন্য হয়ে গেছে। সেখানে মাত্র দুজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা জীবিত আছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের খাবারও দেওয়া হয়নি।
শহরজুড়ে পড়ে থাকা মরদেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও মাইন নিষ্ক্রিয় করাও এখন জরুরি বলে জানান তিনি।
বাড়ার মতো আশপাশের উম সিয়ালা ও গাবরাত আল-শেখ এলাকাতেও ব্যাপক প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও মানবতাবাদী সংস্থাগুলো এসব এলাকায় পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। উম সিয়ালার এক স্বেচ্ছাসেবক জানিয়েছেন, শুধু তাদের এলাকাতেই এখনো অন্তত ২০০টি মরদেহ পড়ে আছে।
সামরিক কৌশলের দিক থেকেও বাড়া ও আশপাশের এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে ‘এক্সপোর্ট রোড’। এই সড়ক ব্যবহার করেই কোর্দোফানের সোনা, বাবলা আঠা, সিলিকা ও কৃষিপণ্য রাজধানীর দিকে পরিবহন করা হয়।
বর্তমানে সেনাবাহিনী সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকা ‘এল-ওবেইদ’ শহরে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছানো শুরু হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের সরবরাহও বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়া পুনর্দখলের পর এল-ওবেইদ ও ওমদুরমানে আরএসএফের ড্রোন হামলার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে বাড়া হারিয়ে আরএসএফ পুরোপুরি পিছিয়ে যায়নি। ইতোমধ্যে গাবরাত আল-শেখ, ওমদুরমান এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পালটা ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাড়া থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের সোদারী ও আল-মাজরুব এলাকায় এখনো আরএসএফের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। সেনাবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়ে এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে বাড়া পুনর্দখলের সাময়িক সাফল্য আবারও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।