তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অন্যতম ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, শিল্প-কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং আবাসিক গ্রাহকরাও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, টার্মিনাল চালু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বুধবার সকালে বন্ধ থাকা এফএসআরইউ পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিতাস গ্যাস কোম্পানির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টার্মিনাল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পাইপলাইনে সংরক্ষিত গ্যাসও শেষ হয়ে এসেছে। ফলে প্রকৃত সংকট বুধবার থেকেই আরও প্রকট হবে এবং টার্মিনাল চালু হলেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুক্রবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলেরেট এনার্জির পরিচালিত এফএসআরইউ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মঙ্গলবার বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। সাধারণ সময়ে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় পিডিবির জন্য বরাদ্দ প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এরই মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও আবার বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে রাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গ্যাস সংকট ও রামপাল কেন্দ্র বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার রাতে দেশজুড়ে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। যদিও বর্ষাকালের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম রয়েছে।
অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকরাও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বুধবারের মধ্যে এফএসআরইউ চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
বর্তমানে দেশে দুটি এফএসআরইউর মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি জানিয়েছে, আগামী ৩০ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হবে। এরপরও দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি পালন করা হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক আমিরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ২০১৫ সালে প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১১ বছরে মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশ, ব্যাংক কমিশন, ইজারা ফি ও বিভিন্ন সরকারি লাইসেন্স ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান কমিশনে ফিলিং স্টেশন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংগঠনটির দাবি, প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের সঙ্গে কমিশনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।