নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন পে-স্কেলের গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে বেতন বৃদ্ধি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, বিভিন্ন ভাতা এবং অবসর-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণনা করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এখনো গেজেট না হওয়ায় বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে বাস্তবায়ন হবে কিংবা নতুন ভাতা কবে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায় তারা গণমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করছেন। অনেকেই নিয়মিত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন পে-স্কেলের সর্বশেষ অগ্রগতি জানার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন অনেক ভোক্তা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হলেও বর্তমানে সরকারি বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জিপিএফসহ প্রায় সব আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস++ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নে সফটওয়্যার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, যদি ধাপে ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে একই কর্মচারীর একাধিকবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, নির্বাচন গ্রেড এবং অবসর-সুবিধা নির্ধারণেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। কারণ পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ছুটির নগদায়নসহ প্রায় সব আর্থিক সুবিধা শেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায় ধাপে ধাপে অবসর-সুবিধা সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় অনেকেই সম্ভাব্য বৈষম্যের আশঙ্কা করছেন।
এ পরিস্থিতিতে প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন আব্দুল মালেক। তার মতে, এতে সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন কমবে এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও বঞ্চিত হবেন না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে এর আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক দিক এবং সফটওয়্যারের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বর মাসেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রায় ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী হলেও এর প্রভাব মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর যেন নেতিবাচক না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।