নেপালে প্রকাশ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘বালিশ কাণ্ড’-এর মতো আরেকটি বড় দুর্নীতি চক্রের ঘটনা। দেশটির পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়িয়ে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগে পাঁচ সাবেক মন্ত্রী, ১০ সাবেক সচিবসহ মোট ৫৫ ব্যক্তি ও একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি তদন্ত কমিশন।
রোববার দায়ের করা মামলায় বলা হয়, চীনা অর্থায়নে নির্মিত এই প্রকল্পের ব্যয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে প্রায় ৭ কোটি ৪৩ লাখ মার্কিন ডলার—যা প্রায় ৮৩৬ কোটি নেপালি রুপি—অবৈধভাবে লেনদেন করা হয়েছে। নেপালের দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এটি দেশটির বিশেষ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা সবচেয়ে বড় দুর্নীতি মামলা।
দরপত্র থেকে ব্যয় অনুমোদন—সব জায়গায় অনিয়ম
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় “ক্ষতিকর অভিপ্রায়” নিয়ে সংশোধন করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় হিসাব ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ানো হয় এবং প্রযুক্তিগত সমীক্ষা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।
২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দরপত্র, ব্যয় নির্ধারণ ও পরামর্শক নিয়োগে ভয়াবহ অনিয়ম করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান
চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং–কে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রকল্প প্রায় এককভাবে তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে
৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রস্তাব দিলেও, নেপাল সরকারের প্রাথমিক অনুমান ছিল
১৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। পরে চাপের মুখে প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে
২১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার ধরা হয়, কিন্তু আড়ালে ব্যয় আবারও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ।
চুক্তি–বিতর্ক, গোপন সমঝোতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
১৯৭৫ সালে ভূমি অধিগ্রহণের পর থেকেই প্রকল্পটি নানা জটিলতা, গোপন চুক্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অসংখ্য সংশোধনের মধ্যে পড়ে। অভিযোগ অনুসারে, সিএএমসি ২০১১ সালেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বার্ষা মান পুনের সঙ্গে গোপনে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। বিষয়টি পরে সংসদীয় কমিটিতে ফাঁস হলে প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
৫৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা
মামলায় নেপালের সাবেক পর্যটনমন্ত্রী
পোস্ত বাহাদুর বোগাটি,
ভীম প্রসাদ আচার্য,
রাম কুমার শ্রেষ্ঠ,
দীপক চন্দ্র আমাত্য, এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী
রাম শরণ মহাতসহ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের বহু কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির চেয়ারম্যান
ওয়াং বো এবং আঞ্চলিক জেনারেল ম্যানেজার
লিউ শেংচেংকেও প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
নেপালে তোলপাড়
বিশাল অঙ্কের অর্থ লুটপাট, প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন জালিয়াতি, গোপন চুক্তি এবং বিদেশি কোম্পানিকে প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে নেপালের রাজনৈতিক মহল ও জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি তদন্ত কমিশন বলছে, প্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালতের রায় অনুযায়ী আরও অনেককেই তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে।