দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) এ অনুমোদন দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে পারমাণবিক প্রযুক্তির এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বলা হয়।
অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বায়রা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানান, পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি মিললেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের আগে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমনের সেফটি ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) নিয়ে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির অনুমোদন কিছুদিন আটকে ছিল। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সমস্যার কার্যকর সমাধান করে। এরপর বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষায় সেফটি ব্যবস্থাটি উত্তীর্ণ হওয়ায় অনুমোদনের পথও খুলে যায়। এর ফলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রূপপুর প্রকল্পের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। বায়রার অনুমোদনের পর প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হবে। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর নিষ্ক্রিয় অবস্থা থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পারমাণবিক স্থাপনায় রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে।
এরপর ‘ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে নির্ধারিত পূর্ণ তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিমাত্রায় পরিচালনা করে ‘ইনিশিয়াল ক্রিটিক্যালিটি’ বা প্রাথমিক স্তরে নেওয়া হবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন পরামিতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো, টারবাইনের সঙ্গে সিনক্রোনাইজেশন এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এ জন্য পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে পৃথকভাবে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
পাওয়ার স্টার্ট-আপ পর্যায়েও বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল সমন্বয় বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাইরের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও সহযোগী সংস্থার সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, উৎপাদন শুরুর পর প্রথমে প্রায় ৩ শতাংশ শক্তি দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে তা ধাপে ধাপে ২০ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এরপর জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। প্রথম দফায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে টানা ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন কার্যক্রম চলতে পারে।
জাতীয় গ্রিডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।