সাংবাদিকদের স্বার্থে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। প্রয়োজন হলে বিষয়টি মন্ত্রিসভায়ও উত্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
রোববার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না হলে পেশাদার ও দক্ষ সাংবাদিকরা কাজের আগ্রহ হারাতে পারেন এবং নতুন প্রজন্মের ভালো সাংবাদিক তৈরির প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবম ওয়েজবোর্ড পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে দশম ওয়েজবোর্ডের দাবিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং এ উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া যথেষ্ট নয়। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদেরও সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।
সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার সাংবাদিকতা করে আসা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এর প্রভাব জনগণ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। কারা সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সাংবাদিকদের লেখালেখি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এ আইন করা হচ্ছে না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হয়রানি, অসত্য তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানোর মতো ঘটনা মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা প্রয়োজন।
কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ ভুলবশত আইনের ব্যত্যয় ঘটালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার যে প্রস্তাব সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এসেছে, সেটিও সরকার বিবেচনা করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শব্দচয়ন ও বিধান কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। গণমাধ্যম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতেই সরকার কাজ করছে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উত্থাপিত দাবিগুলো লিখিতভাবে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লিখিত প্রস্তাব পাওয়া গেলে সেগুলো বাস্তবায়ন ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে সরকারের জন্য সুবিধা হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময় অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় ডিইউজে সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে জনগণের কাছে দেশের বিভিন্ন খবর তুলে ধরেন। অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন করেন তারা। অথচ ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে অনেক সাংবাদিক বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ কামনা করেন।
ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন।
ডিইউজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম দিদার বলেন, দীর্ঘদিন ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়িত না হওয়ায় সাংবাদিকরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে যেসব পত্রিকা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে না, তাদের সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় ডিইউজের সহ-সভাপতি রাশেদুল হক, দফতর সম্পাদক ইকবাল মজুমদার তৌহিদ, কল্যাণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক আবুল কালাম, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রফিক লিটন, নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ গাজী আনোয়ার, তালুকদার এ এইচ এম নুরুল মোমেনসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা বক্তব্য দেন।
এ সময় সিনিয়র সহ-সভাপতি রফিক মোহাম্মদ, নির্বাহী সদস্য এম. মোশররফ হোসাইন, আবদুল্লাহ মজুমদার, ফখরুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও কল্যাণ, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।