সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতার ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছিল তার দুর্নীতির সাম্রাজ্য। বেনাপোল কাস্টমসে দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রভাবশালী অবস্থানকে অস্ত্র বানিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন সুব্রত কুমার চক্রবর্তী—এমন অভিযোগ বহুদিনের। বদলির আদেশে সিলেট এটিআইয়ের অধ্যক্ষ হলেও তার অতীতের ভারী দুনীতি, পাচার, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কাহিনি আজো পিছু ছাড়ছে না।
সরকারি নথির বাইরে গোপনে পরিচালিত সিন্ডিকেট, ফাইল গায়েব, কাগজপত্র কারসাজি, ঘুষ–বাণিজ্য, মামলার আদেশ পরিবর্তন—সব মিলিয়ে সুব্রত কুমার চক্রবর্তী ছিলেন বেনাপোলের ‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’। কর্মকর্তারা বলছেন—তার অনুমতি ছাড়া কোন চালান ছাড় হতো না, আর তার নির্দেশ ছাড়াও কোন কর্মকর্তা বদলি হতে পারতেন না। অভিযোগ রয়েছে—ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, ব্যবসায়ীদের হয়রানি, হুমকি–ধমকি দেওয়া ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকাকে ‘সাদা’ করতে বই প্রকাশ, নীতি–নির্ধারকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, উপহার দেওয়া এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে স্পনসর—এসব ছিল সুব্রতর বহুল ব্যবহৃত কৌশল। তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল “একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সুপরিকল্পিত ইমেজ–ম্যানেজমেন্ট কৌশল।”
সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় সুব্রতের স্ত্রী স্বর্ণবারসহ চোরাচালান চক্রের সাথে যুক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তার স্ত্রী ধরা পড়ার পরও মামলাটি রহস্যজনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যায়। কাস্টমস সূত্র বলছে—এই ঘটনার পরও সুব্রত কুমার চক্রবর্তী তার পদেই বহাল ছিলেন, যা প্রমাণ করে তিনি কতটা শক্তিশালী অভিভাবকত্ব পেয়েছিলেন।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ—আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুব্রত ছিলেন “বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা।” দলীয় অনুগতদের বিপুল অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিয়মিত উপহার দেওয়া, বিভিন্ন প্রকল্পে সুবিধা আদায়—এই কাঠামো তাকে দীর্ঘদিন ধরেই রক্ষা করেছে।
বেনাপোল, ঝিনাইদহ ও ঢাকার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে চাকরি ঝুঁকিতে পড়ত। কারণ সুব্রতের পেছনে বড় শক্তি ছিল।”
অভিযোগে বলা হয়েছে—কাস্টমসের মাধ্যমে প্রতিদিন যে রাজস্ব আসে, তার একটি বড় অংশ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোপাট হয়েছে, যেখানে সুব্রত ছিলেন অন্যতম নিয়ন্ত্রক। এতে বছরে কয়েক শ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে—দুদক, যৌথ বাহিনী, শুল্ক গোয়েন্দা এবং সর্মিপ্ত মন্ত্রণালয় যদি সুব্রতের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত করে, তাহলে আরও অজস্র চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হবে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে বিদেশে বহুতল ভবন, দেশে শত কোটি টাকার সম্পদ, জমি–প্লট, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমাতে পারে?