
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, এই টার্মিনালের সুফল শুধু চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলই ভোগ করবে এবং এটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডেনমার্কভিত্তিক টার্মিনাল অপারেটর এপিএম টার্মিনালস ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার কথা প্রায়ই বলা হয়। তবে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করে তৈরি করার বিষয় নয়, বরং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সেটি স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠবে। চট্টগ্রামে এ ধরনের আরও প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে শহরটি সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানীর রূপ নেবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। সরকারের রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
ডেনমার্কের বিনিয়োগ প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ বন্দরে টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ভবিষ্যতে এ বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি। লালদিয়ায় আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে।
লালদিয়া টার্মিনালের আঞ্চলিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি চালু হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, আশপাশের দেশগুলোর বন্দর ও ব্যবসায়ীরাও এর সুবিধা নিতে পারবেন। আঞ্চলিক বন্দরগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী এখানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হবে।
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে সংশয় থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের গতি এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা ও অংশীদারদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহণ ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং বিনিয়োগে আগ্রহী আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এপিএম টার্মিনালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড জানান, লালদিয়া টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। সেখানে ৭টি শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টর থাকবে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এবং ৯৮ শতাংশের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং এই বন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আগামী ১০ বছরে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং দ্বিগুণ করার প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া, এপিএম টার্মিনালসের বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জ্যাক ক্রেইগ এবং ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নৌপরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ অতিথিরা লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক, চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম সাইফুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।