ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে আবারও উন্মোচিত হয়েছে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, অব্যাহত স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক কারসাজি ও সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেটিকরণ। ১১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীকে তিন বছরের জন্য নতুন এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, একই দিনে জারি হওয়া বিপরীতমুখী আদেশে উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়—ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষায় যা ছিল পূর্বপরিকল্পিত কৌশল, যাতে শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাঙ্ক্ষিত পদে বসানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। ২১ মার্চ প্রকাশিত প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা শিথিলযোগ্য এবং ন্যূনতম তৃতীয় গ্রেড শর্ত ছিল, অথচ তখন সালাম ছিলেন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। মাত্র তিন দিনের মাথায় ২৩ মার্চ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে বয়সসীমার শর্ত বাদ দেওয়া হয়—যা ওয়াসার কর্মকর্তাদের মতে যোগ্য অনেক প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য পথ খালি করার কৌশল। এরপর অস্বাভাবিক দ্রুততায় নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত রেখে সালামকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করা হয়, পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়—অর্থাৎ নিজের যোগ্যতা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। জুলাইয়ে প্রকাশিত নির্দেশনায় সাক্ষাৎকারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে ৩৭ জন আবেদনকারীর কাউকেই সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়নি; বরং কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি একচ্ছত্র ক্ষমতায় তিনজনের নাম অনুমোদন করে পাঠায় এবং সেখানে আবদুস সালামকে শীর্ষে রাখা হয়। ওয়াসার কর্মকর্তাদের অভিযোগ—দুর্নীতির অভিযোগে চার বছর ওএসডি থাকা একজন কর্মকর্তাকে যেভাবে ধাপে ধাপে যোগ্যতা বানিয়ে এমডি পদের উপযোগী করা হয়েছে, তা বহুদিনের পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ। সালামের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং ভয়াবহ—২ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলী পদ পাওয়া, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ–চাঁদা আদায়, ভারত–চীন থেকে নিম্নমানের পণ্য আমদানি করে প্রকল্পে ব্যবহার, দরপত্র নিয়ন্ত্রণে সরাসরি হস্তক্ষেপ, বিদেশ সফরে পছন্দের নারী সহকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করানো, আউটসোর্সিং নিয়োগে ৫–৭ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাতিল–পুনঃবদল বাণিজ্য, বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারসহ ক্ষমতার অপব্যবহার—সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে গঠন হয়েছে দুর্নীতির গভীর, বিস্তৃত ও সুসংগঠিত একটি চিত্র। ওয়াসার প্রশাসনিক দুর্নীতি যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বৃহত্তর দুর্নীতিকাঠামোরই প্রতিফলন—তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় রাজধানীর বাইরে, পাবনা জেলার সুজানগর থানার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের কামারহাট গ্রামে। সেখানে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি গত কয়েক বছরে নিজের নামে ও বেনামে ১০০ বিঘার বেশি জমি ক্রয় করেছেন। গণ–অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত যার আর্থিক অবস্থা ছিল নিতান্তই সাধারণ—আজ তার ‘অজানা উৎসের সম্পদ’ পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, তার দুই ছেলে কানাডায় পড়াশোনা করছে এবং ঢাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট—যা তার পূর্বের আয়–উপার্জন ও পরিচিত আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ঠিকাদার আবু সুফিয়ান লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন—তিনি আড়াই কোটি টাকা দেওয়ার পরও কাজ পাননি, বরং তাকে ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হয়েছে; যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও বহুবার প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে ওয়াসায় প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান—ফলে এমডি পদে কে বসছেন তা সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে বিতর্কিত একজন কর্মকর্তাকে এমডি পদে বসানোর প্রশ্ন ওয়াসার ভেতরেই তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, ওয়াসার ইতিহাসে কখনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার কাউকে পূর্ণাঙ্গ এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নজির নেই—ফলে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতি এখন কাঠামোগত; দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিয়োগ, অনিয়মে অভ্যস্ততা ও জবাবদিহিহীনতা প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে থাকা সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি অর্থ অপব্যবহার ও অনিয়মের বহু অভিযোগ উঠলেও তাকে সরানো হয়নি; গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি আত্মগোপনে গিয়ে পরে পদত্যাগ করেন। তার পর থেকে স্থায়ী এমডি নিয়োগ না দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা—কর্মকর্তাদের মতে ছিল সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য। সার্বিক বিবেচনায় স্পষ্ট—বিজ্ঞপ্তির শর্ত পরিবর্তন, যোগ্যতা বানানোর জন্য অস্বাভাবিক পদোন্নতি, সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া বাতিল, দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত ব্যক্তিকে তালিকার শীর্ষে রাখা—এসবই ছিল ওয়াসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের গভীরভাবে পরিকল্পিত এক চক্র। এতে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এমন দুর্নীতিকবলিত কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ওয়াসার ভবিষ্যৎ কখনো প্রকৃত সেবামুখী হতে পারবে কি না; বরং স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি থামানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। আবদুস সালাম ব্যাপারীকে এমডি হিসেবে নিয়োগ ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যাপক বিতর্ক তাই কেবল একজন কর্মকর্তার নয়—বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।